পৃথিবীতে মেনে হয় কম লোকই আছে, যারা বিড়াল ভালবাসে না। এই প্রাণীটির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। এদের সুন্দর চেহারা ও আদুরে স্বভাব একমুহুর্তেই মানুষের মন ভালো করে ফেলে। কিন্তু এই ভালোবাসার বিপরীতে হতে পারে বড় রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা আমাদের অনেকেরই অজানা। অসতর্কতার কারণে আপনার আদরের প্রাণীটিই হতে পারে সাংঘাতিক কিছু ইনফেকশনের উৎস। সাধারণত, বিড়ালের মল ও লোমের মাধ্যমে যেসব রোগ ছড়ায়, সেগুলো সময় মত চিনতে না পারলে তা আপনার শরীরে কঠিন স্বাস্থ্য সমস্যার সূষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে গৃহে বসবাসকৃত শিশু, বয়স্ক এবং গর্ভবতী নারীদের বেলাই এই ঝুঁকি আরও বেশি। আজকের অনুচ্ছেদে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো যে, বিড়ালের মল ও লোমের মাধ্যমে যেসব রোগ ছড়ায় মানুষের দেহে সেগুলো সম্পর্কে এবং কীভাবে সচেতনতার মাধ্যমে আপনি ও আপনার পরিবার নিরাপদ থাকবেন।
বিড়াল মল ও লোম (Hair/Fur) থেকে অসাবধানতার জন্য কিছু জটিল রোগ মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। নিচে এই রোগগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
টক্সোপ্লাজমোসিস (Toxoplasmosis)
এটি হচ্ছে বিড়ালের মল থেকে ছড়ানো সবচেয়ে ভয়ংকর রোগ। এই রোগটি মূলত 'টক্সোপ্লাজমা গোন্ডি' (Toxoplasma gondii) নামক এক প্রকার পরজীবীর (Parasite) কারণে হয়।
এই রোগ কীভাবে ছড়ায়?
বিড়াল যখন এই পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত কোনো ইঁদুর বা পাখি খায়, তখন তার মলে এই পরজীবী ডিম পাড়ে। মানুষের হাত যখন বিড়ালের মল বা তার লিটার বক্সের (Litter Box) সংস্পর্শে আসে এবং সেই হাত ভালো করে না ধুয়ে কোন খাবার খায় বা মুখে দেওয়া হয়, তবে ঔ ব্যক্তির দেহে এই রোগ ছড়ায়।
কি কি ঝুঁকিি আছে?
সাধারণত মানুষের বেলায় এতে হালকা জ্বর অথবা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। কিন্তু গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তবে ঔ পরজীবির দ্বারা আক্রান্তের ফলে গর্ভবতী নারার গর্ভপাত (Miscarriage) হতে পারে অথবা গর্ভের শিশু অন্ধত্ব ও মস্তিষ্কের বিকৃতি নিয়ে জন্ম গ্রহণ করতে পারে।
কৃমি সংক্রমণ
Roundworm & Hookworm দ্বারা আক্রান্ত বিড়ালের মলে কৃমির ডিম বা লার্ভা থাকে।
কীভাবে ছড়ায়
আপনে যখন বিড়ালের লিটার বক্স পরিষ্কার করবে তখন যদি খালি পায়ে বিড়ালের মলযুক্ত মাটিতে হাঁটেন, তবে এই কৃমির লার্ভা আপনার ত্বকের ভেতর দিয়ে দেহে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে আপনার পেটে ব্যথা হতে পারে, বমি ভাব হতে পারে এবং ত্বকে চুলকানি বা র্যাশ সৃষ্টি হতে পারে।
অ্যালার্জি এবং অ্যাজমা (Allergies and Asthma)
অনেক লোকের ধারণা বিড়ালের লোমের জন্য অ্যালার্জি হয়। কিন্তু মূলত সমস্যা হলো বিড়ালের ত্বকের মৃত কোষ, লালা এবং প্রস্রাব—যদি লোমের সাথে লেগে থাকে,তবে ঔ লোম হতে অ্যালার্জি ও অ্যাজমা হতে পারে।
কীভাবে ছড়ায়
বিড়াল যখন নিজের শরীর চেটে পরিস্কার করে, তখন তার লালা লোমে লাগে ও শুকিয়ে যায় এবং বাতাসে উড়ে বেড়ায়।
ঝুঁকি
এই লোম নিঃশ্বাসের সাথে যখন শরীরে ঢুকে তখন হাঁচি, কাশি, চোখ লাল হওয়া, ত্বক চুলকানো এবং অ্যাজমা বা হাঁপানির সমস্যা মারাত্মক আকার ধারন করে।
দাদ বা রিংওয়ার্ম (Ringworm)
এটি কোনো কৃমি নয়, বরং একটি ফাঙ্গাল বা ছত্রাকজনিত ইনফেকশন।
কীভাবে ছড়ায়
আক্রান্ত বিড়ালের লোম বা ত্বক স্পর্শ করলে এবং বিড়ালের শোবার জায়গা বা বিছানা থেকে এই ফাঙ্গাস মানুষের ত্বকে ছড়াতে পারে। এর ফলে ত্বকে গোল চাকার মতো লাল ও চুলকানিযুক্ত ক্ষত তৈরি হয়।
বিড়ালের মল ও লোম থেকে সুরক্ষিত থাকার উপায় (প্রতিকার)
আমরা যারা বিড়াল পুষি তাদের উপরি-উক্ত রোগগুলো থেকে বেচে থাকার জন্য নিচের সতর্কতা মূলক নির্দেশগুলো কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত:
লিটার বক্স পরিষ্কারের নিয়ম
প্রতিদিন বিড়ালের লিটার বক্স বা বিছানা পরিষ্কার করা উচিত। মনে রাখতে হবে এ সময় অবশ্যই হাতে ডিসপোজেবল প্লাস্টিক গ্লাভস (Gloves) এবং মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। কাজ শেষে হলে অবশ্যই সাবান দিয়ে দুই হাত কনুই পর্যন্ত ভালো ভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা
খেয়াল রাখতে হবে গর্ভবতী নারীরা যেন কিছুতেই বিড়ালের লিটার বক্স পরিষ্কার করতে না পারে। এই কাজটি পরিবারের অন্য কোন দায়িত্ববান ব্যক্তিকে করতে দিন।
বিড়ালের কৃমির ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা
পশু চিকিৎসকের (Vet) পরামর্শ মত বিড়ালকে নিয়মিত কৃমির ওষুধ (Deworming) খাওয়াতে হবে ও সকল প্রকার ভ্যাকসিন সময়মতো দিতে হবে।
নিয়মিত গ্রুমিং ও ব্রাশ করা
প্রতিদিন বিড়ালের লোম একটি চিরোনী দ্বারা ভালো ভাবে আঁচড়াতে হবে, যেন মরা লোম বাতাসে না উড়ে এবং এক জায়গায় জমা হয়। বিড়ালের বিছানা নিয়মিত গরম পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলতে হবে।
খাবারের নিয়ম: খেয়াল রাখতে হবে যাতে বিড়াল কখনোই কাঁচা মাংস বা শিকার করা ইঁদুর/পাখি খেতে না পারে। সবসময় ঘরের তৈরি রান্না করা খাবার বা ভালো মানের কমার্শিয়াল ক্যাট ফুড দিন।
হাত ধোয়ার অভ্যাস: বিড়ালকে আদর করার পর, খাওয়ানোর পর বা তার খেলনা পরিষ্কার করার পর সবসময় সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। বিড়ালকে নিজের বিছানায় ঘুমাতে না দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
বিশেষ দ্র: এই অনুচ্ছেদটি শুধু বিড়ালপ্রেমিদের সচেতনতা বাড়ানের জন্য লেখা। এটি ডাক্তারের বিকল্প নয়। এর চবিগুলো মডিফাই করা।
বিড়ালের সরাসরি সংস্পর্শে কি রোগ ছড়ায়? জানুন লক্ষণ ও প্রতিকার
সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. প্রশ্ন: বিড়ালের লোম কি মানুষের জন্য ক্ষতিকর?
উত্তর: সুস্থ মানুষের জন্য বিড়ালের লোম তেমন ক্ষতিকর নয়। কিড়ালের লোম দ্বারা কোনো রোগ ছড়ায় না। তবে যেসকল মানুষের দেহে অ্যালার্জি, অ্যাজমা বা হাঁপানির রোগ আছে, তাদের জন্যিএটি বিপদজনক। মূলত লোমের সাথে আটকে থাকা বিড়ালের ত্বকের মৃত কোষ, শুকনে লালা এবং প্রস্রাবের কণা বাতাসের সাহায্যে যখন মানুষের শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে, সে সময় হাঁচি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো অ্যালার্জিক রোগ দেখা দেয়।
২. প্রশ্ন: বিড়ালের পশম বা লোম পেটে গেলে কি হয়?
উত্তর: মানুষের পরিপাকতন্ত্রে ভুলবশত বিড়ালের দু-একটি লোম গেলে তেমন বড় কোনো রোগ হয় না।কারণ তা পায়খানার সাথে বের হয়ে আছে। তবে যদি খাদ্যের বা পানির সাথে প্রতিনিয়ত বেশি সংখ্যক লোম পেটে গেলে পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, যদি সেই বিড়ালটির দেহে কৃমি থাকে, তাহলে বিড়ালের লোমে লেগে থাকা কৃমির ডিম বা লার্ভা পেটে গিয়ে মানুষের দেহে কৃমির সংক্রমণ ঘটায়।
৩. প্রশ্ন: বিড়ালের লালা থেকে কি রোগ হয়?
উত্তর: বিড়ালের লালা হতে মানুষের দেহে কঠিন রোগ হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে র্যাবিস বা জলাতঙ্ক (যদি সেই বিড়ালটি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত থাকে)। তাছাড়া বিড়ালের লালায় 'পেস্টিউরেলা' এবং 'ক্যাপনোসাইটোফাগা' নামক ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা কামড়, আঁচড় বা মানুষের দেহের কোনো ক্ষত স্থানে বিড়াল চাটলের ফলে রক্তে প্রবেশ করে। যার ফলে ঔ ব্যক্তির দেহে স্কিন ইনফেকশন, জ্বর ও সেপসিসের মতো রোগ সূষ্টি হতে পারে।
৪. প্রশ্ন: বিড়ালের গায়ের লোম পড়া বন্ধ করার উপায় কী?
উত্তর: বিড়ালের বেশি বেশি লোম ঝঁড়া (Shedding) রোধ করার কার্যকর উপায়গুলো হলো:
প্রতিদিন ব্রাশ করা: প্রতিদিন কমপক্ষে একবার ক্যাট চিরুনির সাহায্যে বিড়ালের আলগা লোম আঁচড়ে পরিষ্কার করা।
সঠিক পুষ্টিকর খাবার:প্রতিদিনের খাবারে ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত ক্যাট ফুড বা কড লিভার অয়েল রাখা। যাতে ত্বক ও লোম ভালো থাকে।
নিয়মিত ডিওয়ার্মিং ও ভ্যাকসিন: বিড়ালকে নিয়ম মেনে কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে। উকুন/ fleas-মুক্ত রাখতে হবে।
পর্যাপ্ত পানি পান: বিড়ালকে প্রতিদিন বেশি পরিমাণ পরিষ্কার পানি পান করাতে হবে, কারণ ডিহাইড্রেশনের কারণেও বিড়ালের লোম পড়ে।
মানসিক চাপ মুক্ত রাখা: বিড়াল ভয় পায় এমন পরিবেশে রাখা যাবে না। অতিরিক্ত ভয় বা মানসিক চাপের কারণেও বিড়ালের লোম পড়ে।
৫. প্রশ্ন: বিড়ালের কারণে সূষ্ট এলার্জি দূর করার উপায় কী?
উত্তর: মানুষের বিড়ালের কারণে অ্যালার্জি বা হাঁচি-কাশি রোগ হলে, নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
- বিড়ালকে মানুষের ঘুমানোর ঘর ও বিছানা হতে দূরে রাখতে হবে।
- ঘরে HEPA ফিল্টারযুক্ত বাতাস পিউরিফায়ার ব্যবহার করতে হবে, যাতে ঘরের বাতাস বিড়ালের ড্যান্ডার ও লোম মুক্ত থাকে।
- বিড়ালকে নিয়মিত ড্যান্ডার-প্রতিরোধী ক্যাট শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করাতে হবে, যাতে অতিরিক্ত লোম না ঝড়ে।
- বিড়ালকে আদর করার পর প্রতিবার ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন