সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গরুর ক্ষুরা রোগের কারণ, লক্ষণ ও ঘরোয়া প্রতিকার: খামারকে লোকসান থেকে বাঁচানোর সম্পূর্ণ গাইড

বিড়াল থেকে কোন রোগ ছড়ায়? জেনে নিন বিড়ালের মাধ্যমে ছড়ানো বিপজ্জনক রোগ ও প্রতিকার

 

বিড়াল থেকে কোন রোগ ছড়ায়


পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়ালের অত্যন্ত জনপ্রিয়ত। এদের আকর্ষণীয় আচরণ এবং তুলতুলে নরম পশম মানুষের মানসিক চাপ দূর করতে ভাল ভূমিকা রাখতে পারে।এছাড়া বিড়াল যেভাবে আমাদের একাকীত্ব দূর করতে পারে, সেরকম অসচেতনতার জন্য এরা নানান রোগের কারণও হতে পারে। অনেকের মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে— বিড়াল থেকে কোন রোগ ছড়ায়? আজকের অনুচ্ছেদে আমরা আলোচনা করব বিড়ালের মাধ্যমে মানুষের কোন কোন রোগ ছড়ায় এবং কীভাবে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে বিপদমুক্ত রাখবেন।

সাধারণত বিড়ালের লালা, মলমূত্র, পশম বা নখের আঁচড়ের ফলে মানুষের দেহে কিছু জটিল রোগ সংক্রমিত হতে পারে। যা 'জুনোটিক ডিজিজ' (Zoonotic diseases) নামে পরিচিত।


বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের ফলে কোন কোন রোগ ছড়ায়

বিড়াল দেখতে শান্ত এবং সুন্দর হলেও এর কামড় বা আঁচড়কে অবহেলা করা একদমই উচিত নয়। বিড়ালের লালা, মুখে এবং নখে নানা রকমের ব্যাকটেরিয়া থাকে। সেজন্য বিড়াল কামড় দিলে বা গভীর আঁচড় দিলে তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা না নিলে বিপদজনক ইনফেকশন হতে পারে। বিড়ালের কামড় বা নখের আঁচড় থেকে যে সমস্ত রোগ ছড়ায় তা নিচে আলোচনা করা হল:


ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (Cat Scratch Disease - CSD)

বিড়ালের কামড় বা নখের আঁচড়ের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি এই রোগটি ছড়ায়। এটি একটি ব্যাকটেরিয়া জনিক রোগ যা প্রধাণত 'বার্টোনেলা হেনসেলি' (Bartonella henselae) নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণত বিড়ালের লালায় থাকে। বিড়াল যখন নিজের শরীর চাটে বা চুলকায়, তখন তার লালায় থাকা এই ব্যাকটেরিয়া নখে চলে আসে। সুতরাং বিড়ালের কামড়ের দ্বারা যেমন এই রোগ মানুষের দেহে প্রবেশ করে তেমনি নখ দিয়ে আঁচড় দিলেও ব্যাকটেরিয়াটি মানুষের রক্ত ও ত্বকে প্রবেশ করে।

ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ



ক্যাট স্ক্রাচ রোগের লক্ষণ

কামড় বা আঁচড় লাগার ৩ থেকে ১০ দিনের ভিতর আক্রান্ত স্থানটি লাল হয় এবং ফুলে যায়। এছাড়াও ছোট ছোট ফোসকা বা পুঁজযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। সেই সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি (সাধারণত বগল, ঘাড় বা কুঁচকির চারপাশ) ফুলে যেতে পারে ও সেখানে ব্যথা হতে পারে। সেই সাথে রোগীর হালকা বা তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং ক্ষুধা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।


র‍্যাবিস বা জলাতঙ্ক (Rabies)

বিড়ালটি যদি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত থাকে ও সেটি যদি মানুষকে কামড়ায় বা আঁচড় দেয়, তবে আক্রান্ত ব্যক্তিরও জলাতঙ্ক হতে পারে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিটি মারাও যেতে পারে।

জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ

জলাতঙ্ক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে জ্বর আসবে, সেই সাথে প্রচন্ড মাথাব্যথা ও শরীর মেজমেজ করবে। কামড়ানোর জায়গায় তীব্র চুলকানি বা অবশ ভাব দেখা দিবে। রোগটি যখন তীব্র আকার ধারণ করবে, তখন রোগীর প্রধান স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়। ফলে রোগির পানির দেখলে চরম ভয় পাবে, যাকে হাইড্রোফোবিয়া বলে ও বাতাসের প্রতি আতঙ্ক তৈরি হবে, যা এরোফোবিয়া নামে পরিচিত।

এ অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ দিয়ে অনবরত লালা পড়তে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি খু্ব উত্তেজিত ও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং ডুক গিলতে খু্ব কষ্ট হয়। শেষ ভাগে হ্যালুসিনেশন শুরু হয়, তাছাড়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অবশ হয়ে যায় এবং শ্বাসকষ্টের জন্য রোগীর মৃত্যু ঘটে।

একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যুহার প্রায় ১০০%। তাই লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথেই ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে দ্রুত জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা নেওয়া জরুরি।


ক্যাপনোসাইটোফাগা ইনফেকশন

Capnocytophaga একটি ব্যাকটেরিয়া যা সাধারণত  বিড়ালের মুখে থাকে। কামড়ের মাধ্যমে এটি যখন মানুষের রক্তে প্রবেশ করে তখন আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র জ্বর, বমি, পেশিতে ব্যথা অনুভব করে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে।

ক্যাপনোসাইটোফাগা ইনফেকশন লক্ষণ

বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের সাধারণত ১ থেকে ১৪ দিনের ভিতর ক্ষতস্থান লাল হয়ে ফুলে যেতে পারে। সেই সাথে তীব্র ব্যথা হতে পারে এবং পুঁজ বা পানি বের হওয়া।

প্রাথমিক উপসর্গ: হঠাৎ করে তীব্র জ্বর দেখা দিতে পারে। সেই সাথে কাঁপুনি, মাথাব্যথা ও শরীর ম্যাজম্যাজ করা প্রাথমিক উপসর্গ হিসাবে দেখে দিবে।

শারীরিক জটিলতা: হঠাত্ করে বমির ভাব বা বমি হওয়া এবং ডায়রিয়া ও পেশি বা জয়েন্টে তীব্র ব্যথা দেখা দিতে পারে।

মারাত্মক রূপ: ইনফেকশন যদি পুরোপুরি রক্তে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে চামড়ায় কালচে বা বেগুনি দাগ দেখা দিতে পারে। সেই সাথে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। অবস্থা যদি জঠিল হয় তাহলে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। পূর্বেই বলেছি যে এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, সুতরাং দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।


টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার (Tetanus)

বিড়ালের কামড়ের ক্ষত গভীর হল ও ক্ষতস্থানে ময়লা লাগলে ধনুষ্টংকার বা টিটেনাসের ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।


বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড় দিলে করণীয় ও তাৎক্ষণিক প্রতিকার

বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড় দিলে অবহেলা না করে নিচের পদক্ষেপগুলো দ্রুত গ্রহণ করতে হবে:

ক্ষত স্থান ধুয়ে ফেলা: বিড়ালে কামড়ানোর বা আঁচড়ানোর পর সাথে সাথে দেহের ক্ষতস্থানটি ক্ষারযুক্ত সাবান এবং চলমান পরিষ্কার পানি দিয়ে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। এভাবে ধুয়ার ফলে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের কার্যক্ষমতা অনেকটাই কমে যাবে।

রক্তপাত বন্ধ করা: ক্ষত স্থান থেকে রক্ত পড়তে থাকলে পরিষ্কার তুলা বা কাপড়ের দ্বারা হালকা চাপ দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করুন।

অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার: ভালো ভাবে ধোয়ার পর আক্রান্ত স্থানে ডেটল, স্যাভলন বা অন্য যে কোনো অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বা লোশন লাগিয়ে দিতে হবে।

ডাক্তারের পরামর্শ ও ভ্যাকসিন: বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের পর যত তারাতারি সম্ভব রোগীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ মত টিটেনাস এবং জলাতঙ্কের (Rabies Vaccine) প্রতিষেধক ইনজেকশন নিতে হবে। কিছুতেই ভ্যাকসিনের ডোজ মিস করা যাবে না।

অ্যান্টিবায়োটিক সেবন: কামড়ের বা আঁচড়ের ক্ষত বেশি হলে ইনফেকশন প্রতিহত করার জন্য ডাক্তাররা সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স দিতে পারেন, যা নিয়ম মেনে শেষ করা জরুরি।

আপনি যদি বিড়ালের মলমূত্র ও লোম হতে কি কি রোগ ছড়ায় তা জানতে আগ্রহি হন, তাহলে নিচের লিংকে ক্লিক করোন:
বিড়ালের মলমূত্র ও লোম হতে যে সব রোগ ছড়ায়


বি:দ্র: এই অনুচ্ছেদটি শুধু সচেতনার জন্য চিকিত্সার বিকল্প নয়। এখানে ব্যবহিত ছবিগুলো মডিফাইকৃত।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পুরুষ মাছই সন্তানের জন্ম দেয়, স্ত্রী নয়! সমুদ্রের বিস্ময় - সি হর্স

  নতুনকে দেখা আর জানার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। আমার ইচ্ছা দুনিয়ার সমস্ত প্রাণী সম্পর্কে জানব। হোক সে দুনিয়ার উপরে বা মাটির নিচের অথবা পানির নিচের। সে স্বপ্ন নিয়েই আমার পথ চলা। সে ধারাবাহিকতাই আজ জানব অফুরন্ত বিস্ময়ের ভিড়ে সবচেয়ে অদ্ভুত আর নজরকাড়া এক প্রাণী সম্পর্কে যার নাম সি হর্স ( Sea Horse ) বা সমুদ্রঘোড়া । প্রাণীটিকে আমি প্রথম দেখি একটি ভিডিওতে, আমার মনেই হয়নি এটি কোনো মাছ । এর বিচিত্র গ ঠ ন ও অদ্ভুত লাইফস্টাইল যুগ যুগ ধরে আমার মত বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে । সি হর্স - নামকরণের ইতিহাস সি হর্সের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Hippocampus । শব্দটা শুনতে বেশ ভারী মনে হলেও এর উৎপত্তি কিন্তু দারুণ । প্রাচীন গ্রিক ভাষার দুটি শব্দ—‘ Hippos’ ( যার অর্থ ঘোড়া) এবং ‘ Kampos ’ ( যার অর্থ সমুদ্রের দানব) মিলেই তৈরি হয়েছে এই নাম । আসলে , এই মাছগুলোর মাথা , বাঁকানো ঘাড় আর মুখের সম্মুখভাগ দেখতে হুবহু ডাঙার তেজী ঘোড়ার মতো । প্রকৃতির এই অদ্ভুত মিলের কারণেই সাধারণ মানুষ ভালোবেসে এর নাম দিয়েছে ‘সমুদ্রঘোড়া’ । শুধু সাধারণ মানুষই নয় , প্রাচীন গ্রিক ও রোমান রূপকথাতেও এর রোমাঞ্চকর গল্প রয়েছে । পৌর...