খামারি ভাইদের জন্য সবচেয়ে আতঙ্কের একটি নাম হলো গবাদি পশুর ক্ষুরা রোগ। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা খুব দ্রুত এক পশু থেকে অন্য পশুতে ছড়িয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে খামারের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো গরুর ক্ষুরা রোগ হলে করনীয কি এবং কীভাবে এই রোগ থেকে আপনার প্রিয় পশুকে মুক্ত রাখবেন।
গবাদি পশুর ক্ষুরা রোগ বা এফএমডি খামারিদের জন্য এক বিরাট আতঙ্কের নাম। এটি অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে খামারের উৎপাদন যেমন লাটে ওঠে, তেমনি পশু মারা যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
গরু, মহিষ, ভেড়া
কিংবা ছাগলের মতো খুর থাকা পশুদের এই ক্ষুরা রোগ হয়ে থাকে। আমাদের দেশে সাধারণত
শীত আসার মুখে আর বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় এই রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ
করে। রোগটি ধরলে গাভীর দুধ দেওয়া একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়, বলদ
গরু দুর্বল হয়ে পড়ে আর ছোট বাছুরগুলো তো সহজেই মারা যায়। তাই লোকসান এড়াতে এই রোগ
নিয়ে আগে থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।
রোগ ছড়ানোর আসল কারণ
অনেকেই মনে করেন এটি সাধারণ কোনো ইনফেকশন, কিন্তু আসলে ক্ষুরা রোগ একটি ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। 'এফথোভাইরাস' (Aptho Virus) নামের এক ধরণের অতি
ক্ষুদ্র আরএনএ ভাইরাসের কারণে এটি হয়ে থাকে। এই ভাইরাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো,
এটি বাতাস কিংবা মানুষের কাপড়ের মাধ্যমেও এক খামার থেকে অন্য
খামারে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত পশুর মুখের লালা, গোবর,
পেশাব বা ক্ষতের রসের সংস্পর্শে সুস্থ পশু এলে নিমেষেই সেও
আক্রান্ত হয়। এমনকি খামারির জুতো বা ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমেও রোগটি ছড়ায়।
সুস্থ গরু হঠাৎ মারা যাওয়ার কারণ
কীভাবে বুঝবেন গরুর ক্ষুরা রোগ হয়েছে?
পশু এই রোগে আক্রান্ত হলে শরীরে বেশ কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন
আসে:
শরীরে চড়া জ্বর
হঠাৎ করেই গরুর গায়ের তাপমাত্রা ১০২° থেকে ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠে যায়। পশু
খাওয়া বন্ধ করে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে।
জিহ্বা ও মুখে ঘা
জিহ্বা, মাড়ি ও
ঠোঁটের ভেতরের নরম চামড়ায় ছোট ছোট ফোসকা ওঠে। দু-একদিনের মধ্যে ফোসকাগুলো ফেটে
গিয়ে দগদগে লাল ঘায়ে পরিণত হয়।
অনবরত লালা ঝরা
গরুর মুখ থেকে সুতোর মতো ঘন লালা অবিরাম ঝরতে
থাকে। মুখে ব্যথার কারণে পশু অনবরত মুখ দিয়ে এক ধরণের চপচপ শব্দ করে।
খুরের মাঝখানে ক্ষত
পায়ের দুই খুরের মাঝখানের নরম জায়গায়
ঘা ও ফোসকা হয়। তীব্র ব্যথার কারণে গরু আর দাঁড়াতে পারে না, ল্যাংচায় বা সারাক্ষণ শুয়ে থাকে।
ওলানে ফোসকা
দুধ দেওয়া গাভীর ওলানে বা বাঁটে ঘা হতে পারে, যার ফলে ব্যথায় গাভী দুধ দোয়াতে দেয় না।
আক্রান্ত পশুর জরুরি পরিচর্যা ও খামারের নিরাপত্তা
খামারে লক্ষণ দেখা দেওয়ামাত্র কোনো সময় নষ্ট না করে নিচের
কাজগুলো করতে হবে:
রোগাক্রান্ত পশুকে আলাদা করা
রোগ ধরা পড়া মাত্রই আক্রান্ত
গরুটিকে সুস্থ পশুদের থেকে একদম আলাদা জায়গায় সরিয়ে নিন।
জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
খামারে বাইরের মানুষের আসা-যাওয়া
পুরোপুরি বন্ধ রাখুন। খামারের দরজায় পটাশ মিশ্রিত পানির গামলা বা ফুটবাথ রাখুন, যাতে ভেতরে ঢোকার আগে সবাই জুতো জীবাণুমুক্ত করতে পারে।
নিয়মিত টিকা দেওয়া
ক্ষুরা রোগ ঠেকানোর একমাত্র আসল অস্ত্র
হলো ভ্যাকসিন। বাছুরের বয়স ৪ মাসের বেশি হলেই ট্রায়ভ্যালেন্ট
টিকা ৬ মি:লি: চামড়ার নিচে ইনজেকশন, ২১ দিনে বুস্টার ডোজ, ৪ মাস অন্তর পুণরাবৃত্তি
করতে হবে। যেমন- Aftovaxpur vaccine, ১৪ দিন ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়নি এমন গাভীর বাচ্চা,
২ মাস ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে এমন গাভীর বাচ্চা, ২ মি:লি: চামড়ার নিচে ইনজেকশন, ১ মাস
অন্তর ২ বার বুস্টার ডোজ, ৬ মাস অন্তর পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
পরিবেশ পরিষ্কার রাখা
আক্রান্ত গরুর লালা ও গোবর জমতে না
দিয়ে দ্রুত দূরে মাটির নিচে পুঁতে ফেলুন। পুরো শেড ব্লিচিং পাউডার বা কস্টিক সোডা মেশানো
পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন।
ঘরোয়া উপায়ে সহজ উপশম
যেহেতু এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এর
সরাসরি কোনো অ্যান্টি-ভাইরাস ওষুধ নেই। তবে লক্ষণ দেখে যত্ন নিলে পশু দ্রুত সুস্থ
হয়ে ওঠে:
মুখ ধুয়ে দেওয়া
১ লিটার পরিষ্কার পানিতে ৫ গ্রাম ফিটকিরি
অথবা হালকা গরম পানিতে সামান্য পটাশ মিশিয়ে দিনে ৩-৪ বার গরুর মুখ আলতো করে ধুয়ে দিন।
মধুর সাথে একটু বরিক অ্যাসিড পাউডার মিশিয়ে ঘায়ে লাগিয়ে দিলে দ্রুত উপশম মিলবে।
পায়ের যত্ন
ক্ষুরের ক্ষতস্থানটি পটাশ পানি বা নিমপাতা ফোটানো
পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে একদম শুকনা রাখুন। মাছি বসা বা পোকা হওয়া আটকাতে চিকিৎসকের
পরামর্শ মতো মলম বা তারপিন তেল ব্যবহার করতে পারেন।
নরম ও তরল খাবার
মুখে ঘা থাকায় গরু শক্ত খড়-ঘাস চিবিয়ে খেতে
পারে না। তাই এ সময় ভাতের মাড়, নরম জাও ভাত, গমের ভুসি বা কচি ঘাস পাতলা করে তৈরি করে খাওয়াতে হবে।
মেঝে জীবাণুমুক্ত করা
গোয়ালঘরের মেঝে ৪% কাপড় কাচার সোডা
(সোডিয়াম কার্বনেট) মেশানো পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে খামারের ভাইরাস দ্রুত মারা যায়।
বিশেষ পরামর্শ
ঘরোয়া এই পরিচর্যার পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়ার
আক্রমণ ঠেকাতে এবং পশুর জ্বর ও গায়ের ব্যথা কমাতে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড
ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছামতো কোনো
ইনজেকশন বা কড়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকুন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ক্ষুরা রোগ একটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায়
এর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টি-ভাইরাস চিকিৎসা নেই। তবে অবহেলা করলে ব্যাকটেরিয়ার
সেকেন্ডারি ইনফেকশনের কারণে পশুর স্থায়ী ক্ষতি বা মৃত্যু হতে পারে। খামারে ক্ষুরা
রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে নিজে কোনো উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ না
করে অবিলম্বে নিকটস্থ উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতাল অথবা একজন রেজিস্টার্ড
ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। পশুর তীব্র জ্বর ও ব্যথার তীব্রতা বুঝে
শুধুমাত্র চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ওষুধ সেবন ও ইনজেকশন পুশ
করুন।
প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: ক্ষুরা রোগের টিকা কখন দিতে হয়?
উত্তর: বাছুরের বয়স ৪ মাস পূর্ণ হলে প্রথম টিকা দিতে হয়। এরপর প্রতি ৬ মাস পর পর নিয়মিত বুস্টার ডোজ দিতে হয়। সাধারণত বর্ষা ও শীতকাল শুরু হওয়ার ঠিক আগে টিকা দেওয়া সবচেয়ে উত্তম।
প্রশ্ন ২: আক্রান্ত গরুর দুধ কি খাওয়া যায়?
উত্তর: ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত গরুর দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে (Boil করে) মানুষ খেতে পারে। তবে কাঁচা বা অপাস্তুরিত দুধ খাওয়া একেবারেই
উচিত নয়, কারণ এতে ভাইরাস থাকতে পারে।
প্রশ্ন ৩: ক্ষুরা রোগ কি মানুষের শরীরে ছড়ায়?
উত্তর: এটি অত্যন্ত বিরল। ক্ষুরা রোগ মূলত গবাদি পশুর
রোগ। তবে আক্রান্ত পশুর কাঁচা দুধ পানের মাধ্যমে বা সরাসরি ক্ষতের সংস্পর্শে এলে
মানুষের হালকা সংক্রমণ হতে পারে, যা মারাত্মক কিছু নয়।
উপসংহার
গরুর ক্ষুরা রোগ খামারির জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির
কারণ। তবে সঠিক সময়ে গরুর ক্ষুরা রোগ হলে করনীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে এই ক্ষতি
অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। ঘরোয়া পরিচর্যা, আক্রান্ত পশুকে
পৃথকীকরণ এবং খামারের কঠোর জৈব নিরাপত্তাই পারে এই রোগ থেকে গবাদি পশুকে রক্ষা
করতে। সর্বোপরি, রোগ আসার অপেক্ষা না করে প্রতি বছর নিয়ম
মেনে ভ্যাকসিন দেওয়া নিশ্চিত করাই একজন সচেতন খামারির প্রধান দায়িত্ব। এছাড়াও আপনার পশুপাখির যত্ন ও সমস্যার সমাধান পেতে হলে আমাদের ফেসবুক পেজ ফলো করতে পারেণ



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন