অনেক সময় বিড়াল আমাদের কামড় বা আঁচড় না দিলেও, তার গায়ে হাত দিলে, তাকে কোলে নিলে বা তার সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণেও কিছু রোগ সরাসরি ছড়াতে পারে। বিড়ালের ত্বক, লালা, চোখ বা কানের স্রাব এবং লোমের সরাসরি সংস্পর্শ থেকে মানুষের শরীরে নিচের রোগগুলো বাসা বাঁধতে পারে:
দাদ বা রিংওয়ার্ম (Ringworm)
এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ফাঙ্গাল ইনফেকশন (ছত্রাকজনিত রোগ)। আক্রান্ত বিড়ালের গায়ের লোম বা ত্বক সরাসরি হাত দিয়ে স্পর্শ করলে এই ফাঙ্গাস মানুষের ত্বকে চলে আসে। এর ফলে মানুষের চামড়ায় গোল চাকার মতো লাল, খসখসে এবং তীব্র চুলকানিযুক্ত ক্ষত তৈরি হয়।
ক্যাম্পাইলোব্যাক্টেরিওসিস (Campylobacteriosis)
এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। আক্রান্ত বিড়ালের শরীর বা মুখের লালা সরাসরি মানুষের হাতে লাগলে এবং সেই হাত না ধুয়ে খাবার খেলে এই ব্যাকটেরিয়া পেটে চলে যায়। এর ফলে তীব্র ডায়রিয়া, পেট কামড়ানো, বমি এবং জ্বর হতে পারে।
সালমোনেলোসিস
Salmonellosis-এটিও একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। বিড়ালকে স্পর্শ করার পর হাত ভালো ভাবে পরিষ্কার না কোন খাবার খেলে এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে এবং টাইফয়েডের অনুরুপ রোগ সূষ্টি করে। এমন কি পেটের পীড়া বা ফুড পয়জনিং তৈরি হতে পারে।
কনজাংটিভাইটিস বা চোখ ওঠা (Pink Eye)
যদি বিড়ালের চোখে কোনো ইনফেকশন থাকে এবং আপনি যদি সেই বিড়ালের চোখের চারপাশ বা মুখ খালি হাতে স্পর্শ করে হাত না ধুয়ে নিজের চোখে হাত দেন, তবে আপনার চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং পুঁজ জমার মতো সমস্যা সূষ্টি হতে পারে।
পেস্টিউরেলোসিস
Pasteurellosis নামের একপ্রকার ব্যাকটেরিয়া বিড়ালের মুখে থাকে। বিড়াল যখন মানুষের মুখের আশেপাশে, ঠোঁটে বা দেহের অন্য কোনো কাটা জায়গায় চাটে বা Licking- করে, তখন এই ব্যাকটেরিয়া ত্বকে ইনফেকশন সূষ্টি করে থাকে।
সরাসরি সংস্পর্শ থেকে সুরক্ষিত থাকার উপায় ও প্রতিকার
হাত ধোয়ার অভ্যাস বা Hand Hygiene
বিড়ালকে স্পর্শ করা, কোলে নিয়ে আদর করা কিংবা তাকে কিছু খাওয়ানোর পর পরেই সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে দুই হাত ভালো করে ধুতে হবে।
মুখ বা ক্ষতস্থান না চাটানো
বিড়াল যেন মুখ, ঠোঁট, চোখ বা দেহের কোনো কাটা স্থান না চাটতে পারে, সেদিকে দূষ্টি রাখতে হবে। বিড়ালকে মুখ দিয়ে চুমু খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
বিছানা আলাদা রাখা
বিড়ালকে আপনার নিজের বিছানা, বালিশ এবং রান্নাঘরের খাবারের টেবিলে বা তাঁকে উঠতে দেবেন না। বিড়ালের ঘুমানোর জন্য আলাদা নরম বিছানা তৈরি করে দিন।
বিড়ালের ত্বকের সমস্যায় চিকিৎসা
বিড়ালের দেহের কোনো জায়গায় লোম উঠতে থাকলে বা কোন প্রকার দাগ দেখা গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পশু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান এবং ফাঙ্গাল ড্রপ বা ক্রিম ব্যবহার করুন। আর যদি আপনার দেহে কোন প্রকার দাদ বা রিংওয়ার্ম দেখা দেয়, তাহলে নিজে নিজে ক্রীম না ব্যবহার করে একজন চর্মরোগ চিকিত্সকের পরামর্শ নিন।
বিড়ালকে নিয়মিত গোসল ও গ্রুমিং
আপনার পালিত বিড়ালের লোম নিয়মিত চিরুনি দিয়ে আঁচড়ান এবং একজন পশু ডাক্তারের পরামর্শ মত ভাল ক্যাট শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করান, যাতে তার দেহে কোনো প্রকার ফাঙ্গাস বা ব্যাকটেরিয়া বাসা বাধতে না পারে।
বিড়াল মানুষের একটি অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী। ঘরে একটি বিড়াল থাকলে একাকীত্ব দূর হওয়ার পাশাপাশি মনও ভালো থাকে। তবে এই ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বিড়ালের কামড়, আঁচড়, মল-লোম কিংবা সরাসরি সংস্পর্শ থেকে যে রোগগুলো মানুষের দেহে বাসা বাধে, তার অধিকাংশই অসচেতনতার ফল।একটু বেশি সতর্কতা, যেমন—বিড়ালকে ধরার পর ভালো ভাবে হাত ধোয়া, তার লিটার বক্স পরিষ্কারের সময় গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করা এবং খেলার সময় আঁচড় বা কামড় থেকে নিজেকে সতর্ক রাখা, এই রোগগুলো থেকে ১০০% সুরক্ষিত রাখতে পারে। এর সাথে আপনার বিড়ালটির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কৃমিমুক্তকরণ এবং সময়মতো সব টিকা দিলে বিড়াল ও মালিক উভয়ই সুস্থ ও বিপদমুক্ত থাকে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন